
চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা আর অবহেলার শিকার হয়ে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে গ্যাংগ্রিন। জন্মের মাত্র ১০ দিনেই নিভে যায় প্রাণপ্রদীপ। বাবা-মা শিশুটির নাম রেখেছিলেন, ইরাজ। স্নেহের ইরাজকে বাঁচাতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ‘পচে যাওয়া’ হাত কেটেও ফেলেছিলেন তারা। তবু শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি তাকে।
এই গুরুতর অভিযোগ চট্টগ্রামের সাজিনাজ হাসপাতালের বিরুদ্ধে। গত ২৫ মে অপর একটি হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনে জন্ম নেওয়ার পর শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে সাজিনাজ হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) ইরাজকে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে ৪ জুন ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
ভুক্তভোগী শিশুটি চট্টগ্রামের বাসিন্দা ইফতেখার হোসেন ও আমাতুল মাকনুন দম্পতির তৃতীয় সন্তান। ছেলের মৃত্যুর ঘটনার দীর্ঘ বিবরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তুলে ধরেছেন আমাতুল মাকনুন।
‘আমি একজন ভুক্তভোগী মা’ শিরোনামের পোস্টটিতে তিনি লিখেছেন, ২৫ মে আমার একটা ফুটফুটে পুত্র সন্তান হয় সি সেকশনে, সার্জিস্কোপ হসপিটালে। বাচ্চার জন্মের সময় অক্সিজেন সমস্যা ও নিউমেনিয়া থাকার ফলে ওর লাইফ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়, কিন্তু ওইখানে না থাকায় চট্টগ্রামের সাজিনাজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। যখন নিয়ে যাওয়া হয় তখন আর কোনো সমস্যা ছিলো না। ওখানে শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. ফয়সাল আহমেদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু হয়। কোরবানের ছুটিতে উনি ঢাকা যাওয়াতে ইম্পেরিয়াল হাসপাতালের শিশু ডাক্তার আনোয়ার হোসেন এসে ওর চিকিৎসা চালিয়ে গেছেন।
তিনি লিখেছেন, প্রতিদিন দুইবার করে আমরা বাচ্চাকে দেখতে যেতাম। শুধু বিকালে ভিজিটিং টাইমে দেখতে দিতো ১-২ মিনিট। এর মধ্যে ওর অবস্থা উন্নতি হয়। পঞ্চম দিন আমাকে ডিউটি ডাক্তার বলে ওকে এনআইসিউ থেকে রিলিজ দিয়ে আমার সাথে কেবিনে দিবে। ওইদিন আমি আমার বাচ্চার সাথে অনুরোধ করে ১৫-২০ মিনিট সময় কাটিয়েছি। হঠাৎ দেখলাম ওর বাম হাতে ব্যান্ডেজ করা। আমি জিজ্ঞেস করায় ডিউটি ডাক্তার বলল— কিছু না, নাথিং।
পরেরদিন সকালে সাজিনাজ হাসপাতালের ডা. ফয়সাল আহমেদ ঢাকা থেকে আসায় শিশুর মাকে ডেকে পাঠানো হয়। এর বিবরণ দিয়ে তিনি লিখেছেন, বাচ্চাকে দেখালো, ওর বাম হাতের তলা পুরো কালো এবং ইনডেক্স ফিঙ্গার, রিঙ ফিঙ্গার কালো হয়ে গিয়েছে, হাত গাঢ় গোলাপি বর্ণের। আমি সাথে সাথে চিৎকার দিলাম। গতকাল দেখে গেলাম ভালো, আজকে কেন এই অবস্থা? আমি বুঝে গিয়েছি ওরা ক্যানোলাতে কিছু ভুল করেছে, এটা স্যালুলাইড হয়ে গ্যাংগ্রিনের দিকে চলে যাচ্ছে। প্রথম থেকে এটা ডা. আনোয়ার বা ডিউটি ডাক্তারদের দোষ। আমি যখন ডিউটি ডাক্তারদের সাথে রাগ করলাম, ওরা উল্টা আমাকে অনেক কাহিনী বুঝাচ্ছিল। ওরা শুরুতে মানতে নারাজ, পরে ওরা ঠিকই স্বীকার করলো ওদের বিশাল বড় ক্রাইম হয়েছে। ওরা তখন বলল চট্টগ্রামে এর চিকিৎসা নাই, ঢাকা নিয়ে যান। আমরা সব ঠিক করে ফেললাম। কিন্তু এরই মধ্যে চট্টগ্রামের আরো কিছু ডাক্তার অন কলে এবং পার্কভিউ হাসপাতালের ভাস্কুলার সার্জন ডা. মিনহাজকে (ভাসকুলার সার্জন) ডাকাল। ওরা কিছু ট্রিটমেন্ট দিল এবং কিছুটা ভালোর দিকে বলল। আমরাও দেখলাম কালো ভাবটা কমেছে। ওরা বলল পারবে, যেন আমরা ঢাকায় না যাই। ওইদিন আর গেলাম না।
তিনি আরও লিখেছেন, পরেরদিন গিয়ে দেখি ওর অবস্থা আরো খারাপ। হাতের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। তৎক্ষনাৎ ঢাকায় নিয়ে যাব, এর আগে বলল ওর জার্নিটা ঠিকভাবে যাওয়ার জন্য— একটু ওই জায়গা কেটে দিয়ে ছোট একটা সার্জারি করলে ও কম কষ্ট পাবে। তাতেও রাজি হয়ে আরেকজন পেডিয়াট্রিক সার্জন ডা. আদনান ওয়ালিদকে ওরা ডেকে অপারেশন করাল। তারপর ঢাকায় গেলাম ৩ ঘন্টা ৩০ মিনিটে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স করে। ঢাকার ইবনে সিনাতে ব্যান্ডেজ খোলার পর দেখলাম হাতের কব্জি পর্যন্ত গ্যাংগ্রিন। আর ওইটা থেকে পুরো বডিতে অনেকটায় ইনফিকটেড হয়েছে। ওর বডির অরগান কাজ করা বন্ধ করে দিচ্ছে। তারপর ওরা বললো ইবনে সিনা এই বাচ্চার রিস্ক নিবে না। আমরা এভারকেয়ারে নিলাম।
এভারকারে শিশুর চিকিৎসা অভিজ্ঞতা জানিয়ে আমাতুল মাকনুন লিখেছেন, ওরা এতো ভালো ভাবে আমার বাচ্চার ট্রিটমেন্ট শুরু করেছে। তারপর ওরা বললো যেহেতু হাতটা গ্যাংগ্রিন হতে হতে উপরে উঠেছে, তাই হাত কেটে ফেলে দিতে। এর মধ্যে ঢাকার কোনো ডাক্তার, হসপিটাল বাদ রাখিনি ওর চিকিৎসা কোথায় ভালো হবে খোঁজ নিতে। ওর বাঁচার চান্স ৫০/৫০। কিন্তু সাথে এটাও বললো শাজিনাজ হাসপাতাল যে অপারেশনটা করেছে তাতে অনেক ভুল আছে। প্রথমত, ওরা ক্লিন করেনি। দ্বিতীয়, ওরা চাইলেই ওখানে ফেইক স্কিন বসাতে পারত। তৃতীয়ত, যেদিকে করার দরকার ছিল, ওদিকে অপারেশন করেনি। আর চতুর্থত, ৪-৫ টা রক্তনালী কেটে ফেলেছে।
ছেলের প্রাণ রক্ষার্থে হাত কেটে ফেলার অনুমতি দেয় পরিবার। শিশুটির মা আরও লিখেছেন, আমরা ওকে হাত কাটার পারমিশন দেই এভারকেয়ারে। কিন্তু ডাক্তাররা বলেই দিয়েছিল ও অনেকটায় ইনফেকটেড। ৩ জুন এভারকেয়ারে ওর অপারেশন হয়। ওর হাত ফেলে দেই। মনকে এই বলে বুঝ দেই ওইদিন— হাত ছাড়া না হয় আমার বাচ্চা বাঁচবে। কিন্তু পরের দিন পুরো শরীরের কালার চেঞ্জ হলো, প্রেসার লো হলো, পেট ও লিভার ফুলে গেল। দুইবার কার্ডিয়াক অ্যাটাকে আমার নিষ্পাপ যোদ্ধা সন্তান মারা গেল ।

Leave a Reply