
ইরান যুদ্ধ ও তার আগে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের মধ্যে যখন ইসরায়েল সরকারের প্রতি নজিরবিহীন মাত্রায় অবিশ্বাস ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই মার্কিন কংগ্রেস দুই দেশের সামরিক সম্পর্ককে আরও বেশি জোরালো ও একীভূত করার একটি বিতর্কিত প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ২০২৭ সালের ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট’ (NDAA)-এর হাউস সংস্করণে অত্যন্ত গোপনে ‘সেকশন ২২৪’ বা ‘ইউনাইটেড স্টেটস-ইসরায়েল ডিফেন্স টেকনোলজি কোঅপারেশন ইনিশিয়েটিভ’ (যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সহযোগিতা উদ্যোগ) শিরোনামে এই নতুন ধারাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। খবর আনাদুলো এজেন্সির
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই একটিমাত্র আইনি ধারা মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাথে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মধ্যকার সম্পর্ককে এতটা গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলবে, যা ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ২০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি সামরিক সহায়তার চেয়েও অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী ও প্রভাবশালী হবে।
প্রস্তাবিত এই 'সেকশন ২২৪' মূলত দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক গবেষণা ও উন্নয়ন, যৌথ অস্ত্র উৎপাদন, যৌথ উদ্যোগ (জয়েন্ট ভেঞ্চার), লাইসেন্সিং চুক্তি এবং সামগ্রিক মার্কিন-ইসরায়েল সামরিক-শিল্প খাতের সহযোগিতার একটি স্থায়ী রূপরেখা তৈরি করবে। যদিও ওয়াশিংটন ও তেল আবিব দীর্ঘদিন ধরে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে একসঙ্গে কাজ করছে, তবে নতুন এই বিধানের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, স্বায়ত্তশাসিত সামরিক ব্যবস্থা, ডিরেক্টেড এনার্জি (লেজার অস্ত্র), সাইবার নিরাপত্তা এবং বায়োটেকনোলজির মতো ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রতিটি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাতে সমন্বয় ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পাবে।
এমনকি এই নীতিমালায় ‘নেটওয়ার্ক ইন্টিগ্রেশন’ এবং ‘ডেটা ফিউশন’ বা তথ্য একীভূতকরণের প্রস্তাবও করা হয়েছে, যার সহজ অর্থ হলো মার্কিন সামরিক বাহিনীর গোপন তথ্য ও ডেটা খুব শীঘ্রই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিজস্ব তথ্যে পরিণত হতে পারে। যদি এই প্রস্তাবটি সম্পূর্ণরূপে পাস ও কার্যকর হয়, তবে এটি বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের (এমনকি নেটো মিত্রদের) চেয়েও ইসরায়েলের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চতর ও গভীরতম সামরিক-শিল্প একীকরণের পথ সুগম করবে।
এই পদক্ষেপটি মার্কিন রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ইসরায়েলের প্রভাবকে এক নজিরবিহীন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে ইসরায়েল সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সরাসরি কর্মসংস্থান বা চাকরি সৃষ্টির মাধ্যমে মার্কিন রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারটি ব্যবহার করার সুযোগ পাবে। মিসিসিপি এবং আরকানসাসের মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে নতুন অস্ত্র উৎপাদন কারখানা স্থাপন বা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ইসরায়েল মার্কিন মাটিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কৃতিত্ব দাবি করতে পারবে, যা পরোক্ষভাবে ওই সব অঞ্চলের মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের নিজেদের পক্ষে টানতে সাহায্য করবে।

Leave a Reply